কোরিয়া যাওয়ার পথে পিএইচডি গবেষক ‘অপহরণ’

বুধবার রাত একটায় বিমান ওড়ার কথা ছিল। পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে আশকোনার বাসা থেকে রাত ১০টার দিকে বের হয়েছিলেন পিএইচডি গবেষক এনামুল হক। বন্ধুর ছোট ভাই তাঁকে রিকশায় উঠিয়ে বিদায় নেন। এরপর থেকে নাই হয়ে যান এনামুল। পরদিন বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ‘অপহরণকারী’ পরিচয়ে আসে ফোন। এনামুলের পরিবারের কাছে শুক্রবার সকাল ছয়টার মধ্যে দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়। শুক্রবার সকালে পরিবার কথিত ‘অপহরণকারীদের’ দেওয়া নম্বরে এক লাখ টাকা পাঠিয়েও নিজের স্বজনকে ফেরত পায়নি।

 

 

এ বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে দক্ষিণখান থানায় এনামুল নিখোঁজ হয়েছেন মর্মে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও পুলিশ কোনো সূত্র খুঁজে পায়নি। তবে জিডিতে টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ নেই।

নিখোঁজ এনামুল ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বৃত্তি নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কিওংপুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (কেএনইউ) পিএইচডি করছেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি পাবনা।

এনামুলের স্ত্রী নাজমিন সুলতানা শুক্রবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে ২৩ অক্টোবর দেশে এসেছিলেন এনামুল। বুধবার রাত একটার দিকে ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজে তাঁর ফেরার কথা ছিল। সে জন্য তিনি বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি ঘুরে বিমানবন্দরের কাছে আশকোনায় এক বন্ধুর ছোট ভাইয়ের বাসায় উঠেছিলেন। বুধবার রাত ১০টার দিকে নিজের ছোট হ্যান্ড ট্রলি আর ল্যাপটপের ব্যাগ কাঁধে বিমানবন্দরের উদ্দেশে বের হন এনামুল। বন্ধুর ছোট ভাই এনামুলকে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিচ্ছেন—এমন দৃশ্যও ওই এলাকার সিসি ক্যামেরায় দেখা গেছে। তিনি রিকশা থেকে নামার পর কোরিয়া থেকে শাকিল নামে আরেক পরিচিত ছোট ভাই ফোন করেন। তখন এনামুল তাঁকে জানান, তিনি বিমানবন্দরে ঢোকার মুখেই রয়েছেন। এই শেষ। এরপর থেকেই তাঁর কোনো খোঁজ নেই। যে এয়ারলাইনসে তাঁর যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে তাঁরা খোঁজ নিয়েও কিছু পাননি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, এনামুলের নিখোঁজের বিষয়ে তাঁদের পরিচিত এক তরুণ ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর কাছে অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। বলা হয় এনামুল হকের পরিবারকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। পরে এনামুলের স্ত্রী তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন।

এনামুলের স্ত্রী নাজমিন বলেন, ওই নম্বরে ফোন করা হলে তারা এনামুলের বাংলাদেশে ব্যবহৃত নম্বর থেকে নাজমিনকে ফোন দেয়। বলে, এনামুল ভালো আছে, সমস্যা নেই। যা বলা হবে সব গোপন রাখতে হবে। তারাই এনামুলকে গুম করে রেখেছে। তাদের কথামতো কাজ করলে এনামুলকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এনামুলের সঙ্গে নাজমিনের কোনো কথা হয়নি।

নাজমিন বলেন, এরপর কথিত অপহরণকারীরা বৃহস্পতিবার দেড় লাখ টাকা চায়। তখন তিনি বলেন, এত রাতে কীভাবে টাকা জোগাড় হবে, শুক্রবার ব্যাংকও বন্ধ। তারা বলে, ভোর ছয়টার মধ্যে যদি দেন, তাহলে ভোরে ফেরত দেব। ভোরে ফেরত দিতে সুবিধাও হবে। অনেক চেষ্টা করে শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে তাঁরা অপহরণকারীদের দেওয়া নম্বরে এক লাখ টাকা পাঠান। অপহরণকারীরা আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলে। এরপর থেকেই তাদের ফোনগুলো বন্ধ।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, টাকা দিয়ে অপহরণকারীদের ফোনগুলো বন্ধ পেয়ে তাঁরা পুলিশের কাছে বিষয়টি জানিয়েছেন।

তবে রাজধানীর দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তপন চন্দ্র সাহা বলেন, এ ব্যাপারে থানায় একটা জিডি হয়েছে। আশকোনায় বন্ধুর বাসা থেকে এনামুল হকের বিমানবন্দর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছাননি। অন্য কোথাও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে জিডিতে টাকার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি বা পরে পুলিশকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি বলে জানান ওসি।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*